ভুতের সঙ্গে এক রাত

ভুতের সঙ্গে এক রাত  

অতনু সরকার 

ভুতের সঙ্গে এক রাত




প্রতিদিনের মতো আজও এক ক্লান্ত দুপুর। অলসভাবে বয়ে যাচ্ছিল  দুপুরটা। ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি, চারিদিকে একটা অলস ভাব। মাঝে মাঝে প্রচন্ড বৃষ্টি আবার মাঝে মাঝে প্রখর রৌদ্র। কখনো বা দুপুরে ভ্যাপসা গরমে সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে মানুষ। আমি যাযাবর মানুষ।  জীবনে চলার পথে বিরামহীন এই চলমান জীবনটাকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বয়ে নিয়ে বেড়ানো আমার নেশা। শুধুমাত্র নিজের স্বপ্ন আর লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে আমার জীবন। যা কিছু পিছনে পড়ে রইল সেসব দায়িত্ব আর কর্তব্যের খাতিরে করতে হয় তাই করা।  কিন্তু আমার বোহেমিয়ান জীবনে কোন কিছুর তোয়াক্কা করি না আমি। মাঝে মাঝে বড্ড একা লাগে বন্ধু বান্ধব হীন এক দীর্ঘ একাকীত্ব জীবনে লম্বা পথ পাড়ি দিতে দিতে নিজেকে কখনো কখনো ক্লান্ত মনে হয়। কিন্তু ওই যে বললাম আমার এই চলমান বোহেমিয়ান জীবনে ক্ষণিকের সেই ক্লান্তি আর একাকীত্ব নিজের সহনশীলতার মধ্যে দিয়েই দূর করে দিয়েছি। 


চলেছি এক অজানা অচেনা জীবন সন্ধানে। আত্মনিমগ্ন সেই আত্মসন্ধানে কখনো কখনো সত্যি নিজেকে একা মনে হয়।  মনে হয় যদি কেউ থাকতো বন্ধু হয়ে। অন্তত কথা বলার কিছুটা সময় না হয় কেটে যেত। কথা বলে ভাবের ঘরে ভালোবেসে নয় হয়তো বা বন্ধুত্বের লৌহ কঠিন আবহে। হয় না, হয়ে ওঠে না। কারণ আমাদের চাওয়া পাওয়া গুলো বড্ড বেশি হয়ে যায়। যেটুকু চাই মাঝে মাঝে সেটুকু মনে হয় অনেকখানি। অথচ সেই চাওয়া হয়তো খুব সামান্যই।  জীবন বৃত্তান্তের ভারে একটুখানি চাওয়ায় কখনো কখনো বিরাট আকার ধারণ করে। তারপর মনের উপর তৈরি করে বোঝা। 


সকালের কাজ শেষে শুয়েছিলাম একা। আকাশ পাতাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হাবিজাবি কত কিছুই মনের অন্তরে দোলা খেয়ে ওলট পালট হয়ে জট পাকিয়ে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। এই  মস্তিষ্কের মধ্যে কি যে জট পাকায় তা বোঝা ভারি মুশকিল। 


জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মনে হয় এই জীবন আর এ জীবন বৃত্তান্তের জন্য আমি দায়ী।  চলার পথে যে ভুল পদক্ষেপ নিয়েছি সেই ভুল পদক্ষেপের মাশুল গুনতে গুনতে কখনো কখনো ক্লান্ত হয়ে যাই।  কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতার ভান্ডার আর বৃদ্ধি পায়, বড় হতে থাকে। কখনো কখনো ফোনটা বিরক্ত লাগে, এমনি বিরক্তিতে ফোনটাকে পাশে রেখে শুয়ে ছিলাম। বাইরে প্রচন্ড রোদ আর ঘরের গুমট আবহাওয়া আমাকে বেশি বিরক্ত করে ফেলেছিল। সেই সময় ফোনটা বেজে উঠলো।  অজানা এক একটা নাম্বার। অচেনা নাম্বার দেখে বিরক্ত লাগে।  বিরক্ত কর ফোন থেকে বাঁচার জন্য অজানা নাম্বার খুব একটা ধরা হয়ে ওঠে না। তবু কিছু একটা ভেবে ফোনটা হাতে নিয়ে দুবার হ্যালো হ্যালো বলতে ওপার থেকে হেসে এলো এক স্নিগ্ধ নারী কন্ঠ।  


আমি বললাম - কে বলছেন ? 


নারী কন্ঠে প্রশ্ন - আপনি কি অর্পণ কথা বলছেন? 


  • হ্যাঁ বলছি আপনি কে বলছেন?


কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। আমি আবার বললাম -কে বলছেন ? 


এবার শান্ত স্নিগ্ধ গলায় উত্তর এলো - মধুজা, আমি মধুজা বলছি।  


ফোনটা হাতের থেকে পড়ে যাচ্ছিল শক্ত করে ধরলাম প্রায় ২৭ বছর পর নামটা শুনলাম। আমি বললাম - মধুজা মানে মধুজা সরকার। 

তেমনি শান্ত গলায় ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর এল - মধুজা সরকার ছাড়া আর কোন মধুজা যাকে চিনতেন নাকি? 


মধুজা সরকার ছাড়া যে আরো অনেক মধুজা সরকার বা অন্যান্য মধুজা থাকতে পারে সেটা বোধহয় ফোনের অপর প্রান্তে যিনি আছেন তার ভ্রম হয়েছে। অথবা হতে পারে কিছুটা আবেগী হয়ে কথা বলেছেন। 


মধুজা সরকার নামটা আমার কাছে ২৭ বছর পরে ফিরে এলো।  ২৭ টা বছর কম নয় কিন্তু। মন চলে গেল ২৭ বছর আগে। ও প্রান্ত থেকে উত্তর এলো -  আর কোন মধুজাকে খুঁজছেন নাকি? 

 

আমি উদাস গলায় উত্তর দিলাম-  না। ২৭ বছর আগে যে হারিয়ে গিয়েছিল তাকে খোঁজার চেষ্টা করছি। কেমন আছো তুমি মধুজা? 

 

শান্ত স্নিগ্ধ গলায় বলল- কেমন আছি কথাটা এক এক জনের কাছে এক এক রকম উত্তর দেওয়া যায়। তুমি তো আমাকে চিনতে পেরেছ এবং এই চেনার পরে তোমাকে কি উত্তর দেব ভেবে পাচ্ছি না।  তবে আপাতদৃষ্টিতে একটা উত্তর তোমাকে দেবো। ভালো আছি। 


ভালো আছি কথাটা কেমন যেন শোনালো। একটা উদাস ভাব সেই ভালবাসি কথাটার মধ্যে প্রথিত হয়ে আছে। 


আমাকে বলল - তুমি কেমন আছো?  

আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম। ফোনের এপ্রান্তে হয়তো সেই মৃদু হাসিটা অপরপ্রান্তে মধুজা সরকারের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। বললাম -  আমি কোনদিনই খারাপ ছিলাম না। সব সময় ভালো থাকার চেষ্টা করেছি। 

মধুজা বলল -  কোথায় আছো এখন? 

 

আমি বললাম -  চলমান এই যাযাবর জীবনের ক্লান্ত শরীরটাকে সময়ের সাপেক্ষে টেনে নিয়ে যেতে যেতে এই মুহূর্তে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে আছি। বলতে পারো কাজের সূত্রে আছি।


মধুজা -  জিয়াগঞ্জ? তাহলে তো আমার কাছাকাছি। 


বললাম - মানে?


মধুজা - মানে কিছু না। আমি পলাশিতে থাকতাম। কিন্তু এই মুহূর্তে আছি স্কটল্যান্ড। 


আমি বললাম - স্কটল্যান্ড। সেখান থেকে আমার নাম্বার কোথায় পেলে তাও আবার ২৭ বছর পর।


মধুজা হাসল। এপ্রান্তে সে হাসির শব্দ বেশ পরিস্কার শোনা গেল। তারপর বলল - চাইলে সব সম্ভব। 


আমি বললাম  - কথাটা ঠিকই, চাইলে সবই সম্ভব কিন্তু সেই সম্ভবটা ২৭ বছর আগে হলো না কেন? তখন কি তুমি চাওনি? যাক সে কথা ২৭ বছর আগের কথা তুলে এখন আর কোন লাভ হবে না। তবে অবাক হচ্ছি যে ২৭ বছর পরেও তুমি আমাকে মনে রেখেছো এটা ভেবে। 


মধুজা একটু থামল একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফোনের অপর প্রান্তে মিলিয়ে গেল। তারপর বলল - ফিরে যেতে চাই না সেসব দিনে। ফিরে গেলে অনেক কথার উত্তর হয়তো আমাকে দিতে হবে। তোমাকেও দিতে হবে।  তাই অতীত নিয়ে আর ঘাটতে চাই না। 


আমি বললাম - সেসব দরকারই বা কি?  যাদের জীবন থেকে সাতাশটা বছর চলে গেল তাদের আর পুরনো দিনের সেইসব কথা মনে রেখে লাভ কি হবে? তার থেকে বরং বলো, তুমি হঠাৎ ফোন করলে আমায়?


মধুজা বলল - মনে পড়ল তাই ফোন করলাম। অনেক কষ্টে যোগাড় করেছি। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ তাই ফোন নাম্বার জোগাড় করতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি  আমাদের পুরনো বন্ধু কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ আছে এখনো। তাই তোমার নাম্বারটা জোগাড় করতে খুব একটা অসুবিধা আমার হয়নি।

 

  • ভালো লাগলো যে তুমি এতদিন পরেও আমায় মনে রেখেছো।


মধুজা শান্ত গলায় বলল - আমি কলকাতা ফিরছি আগামী সোমবার। সেই দিনই আমি ফিরব পলাশীতে। আসবে দেখা করতে ?


আমি বললাম- যেতে তো আমার আপত্তি নেই কিন্তু তোমার পরিবারের লোকেরা?  তাদেরকে তুমি কি ভাবে …


বাড়িতে এখন কেউ থাকেনা। চাইলে তুমি বাড়িতেও আসতে পারো না হয় কোন হোটেলে।  এসো না।


আমার মনের মধ্যে খটকা লাগল, বললাম - মানে তোমার তো সংসার আছে। স্বামী আছে। তাহলে হোটেলে আমার সঙ্গে কেন দেখা করবে? বরং তোমার বাড়িতে যাই একদিন। দেখা করে চলে আসবো না হয়। হোটেল হলে আপত্তি নেই কিন্তু ……।।


ফোনের অপর প্রান্তে এক আশ্চর্য রকম শান্ত গলায় বলল - ২৭ বছর আগে যদি আমি তোমায় বলতাম,  তাহলে কি এই কিন্তু আসতো? নিশ্চয়ই থাকতে তাই না।  আচ্ছা একটা দিনের জন্য তুমি এসো। সোমবার। ঠিকানা আমি তোমায় পাঠিয়ে দেবো চিন্তা করতে হবে না। কোথায় থাকবে কি করবে সেসব দায়িত্ব আমার। দয়া করে এসো প্লিজ। 


ফোনটা কেটে দিল।  আমি ভাবলাম ২৭ বছর পর মধুজা আমাকে ফোন করল। কিন্তু ফোন নাম্বারটা পেল কোথায়। সেই সময় আমাদের যে বন্ধু সার্কেল ছিল তাদের সঙ্গে কারোরই আর যোগাযোগ নেই আমার।  হতে পারে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কোথা থেকে জোগাড় করেছে। কিন্তু এই ২৭ বছর পরে আবার কেন আমাকে ডাকছে। নানা রকম ভাবনার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিলাম সোমবার যাব। দেখি কোন ঠিকানা পাঠায়। ফোনটা আবার রেখে দিলাম।  মিনিট দশেক পরে একটা এসএমএস এলো। বাড়ি নয়, লাল বাগের একটা হোটেলের ঠিকানা। দেখা করার সময় সন্ধ্যে সাতটা । 


সোমবার বিকেল পাঁচটা নাগাদ জিয়াগঞ্জ থেকে ট্রেন ধরলাম। জিয়াগঞ্জ থেকে সরাসরি গাড়ি করেও যাওয়া যেত। কিন্তু যেহেতু হোটেলটা স্টেশন এর কাছাকাছি তাই ট্রেন পথ কেই বেছে নিলাম।  


যখন লালবাগ পৌঁছালাম। সেই নাম্বারে ফোন করলাম। কেটে গেল। আবার করলাম, আবার  কেটে গেল। স্টেশনে বসে আছি, সাড়ে ছটা নাগাদ স্টেশন থেকে বেরোবো।  কত মানুষের আনাগোনা কত ধরনের মানুষ যাচ্ছে আসছে। আরো দুবার চেষ্টা করেছিলাম ফোন করার। কিন্তু ফোনটা টিক টিক করে শব্দ হয়ে কেটে গেল।  মনের মধ্যে একটা দোলাচল শুরু হল। তাহলে আমাকে কি কেউ ব্ল্যাকমেইল করতে চাইছে কোন নারীকে দিয়ে?  অসম্ভব নয়। মধুজা কেন ফোনটা ধরছে না?  যাই হোক সব রকম সন্দেহ আর দোলাচল কে পাশ কাটিয়ে ছটা তিরিশ নাগাদ স্টেশনের বাইরে এলাম। সেখান থেকে একটি অটো রিক্সা নিয়ে হোটেলের দিকে রওনা হলাম। সাতটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। আবার ফোন করলাম ধরল না। রিং হওয়ার আগেই কেটে গেল। রিসিপশনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম মধুজা সরকার নামে কেউ আছে কিনা। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার ফোনটা বেজে উঠলো “২১০ নম্বর ঘরিসেপশনে বলা আছে চলে এসো”। 

বিস্মিত হলাম সময় জ্ঞান দেখে। এতক্ষণ যে আমার ফোন ধরছিল না ঠিক সাতটায় তারই ফোন।  যাক গে ২১০ নম্বর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরজার সামনে দাঁড়াতেই দরজাটা খুলে গেল। হয় তো বা মধুজাই খুলে দিল। 


আমার কল্পনার সেই মধুজাকে যেমন দেখেছিলাম ২৭ বছর পরেও ঠিক একই রকম দেখছি।  একটু বয়স বেড়েছে । কিন্তু সেই সৌন্দর্য সেই লম্বা চুল সেই টানা চোখ, শরীরের গড়ন সব যেন ঠিক আগের মতই। এসো ভিতরে এসো। ডাকল মধুজা। 


মধুজা হাসতে হাসতে বলল  - ভাবছ তো তোমায় হোটেলে ডেকেছি কেন ? 


আমি বললাম - সেটাই  স্বাভাবিক নয় কি ? 


মধুজা বলল -  একদম স্বাভাবিক।  আমি  ডেকেছি তোমাকে আমার সেই অধিকারে, যে অধিকারে একদিন আমি তোমায় কাছে পেতে চেয়েছিলাম।  


আমি চারিদিকে ঘরটার দিকে তাকালাম। বেশ সুন্দর সাজানো গোছানো পরিপাটি করে রাখা।  একটা খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে উদাস ভাবে বললাম -  সত্যিই ।


মধুজা আমার কাছে এলো। আমার দুই হাত ধরে বসিয়ে দিল বিছানার উপর। তারপর আমার খুব কাছে এসে বলল -  বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি। আমায় একটা কাজ করে দিতে হবে। 


আমি বললাম  - কি করতে হবে বলো?  

মধুজা বলল পরে বলছি। কি খাবে বলো আজ রাতটা তোমাকে এখানেই থাকতে হবে, আমার সঙ্গে। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে একই বিছানায়। 


আমি মধুজার দিকে তাকালাম। ওর চোখে সেই জেদি মধুজা কে দেখলাম তাও আবার ২৭ বছর পরে।  


রাতে খাওয়া শেষ করে বিছানায় বসে আছি। ফেরার চেষ্টা করে ছিলাম কিন্তু ফিরতে পারলাম না। বাইরে খুব জোরে বৃষ্টি নেমেছে। মেঘ ডাকছে। মধুজা আমার পাশে এসে বসলো। আমার হাতে একটা চিঠি দিয়ে বলল এর মধ্যে লেখা আছে তোমায় কি করতে হবে?  করে দিও। 

আমি চিঠিটা খুলতে যাব ঠিক তখনি মধুজা আমার হাতটা চেপে ধরলো বলল - এখন নয় যখন ফিরে যাবে বাড়ী তখন খুলবে, এখন রাখ। চিঠিটা বুক পকেটে রেখে দিলাম। 

দেখতে দেখতে ঘড়ির কাটা এগারোটা ছুয়ে গেল। মধুজা বলল -চলো শুয়ে পড়ি খুব ক্লান্ত লাগছে।

 আমি - তুমি উপরে শুয়ে পড় আমি  নীচে শুয়ে পড়ব। 

মধুজা এবার খুব জোরে জোরে হাসল। তারপর বলল -  আমার পাশে শোবে আজ। তোমাকে না পাওয়ার সাধ আজ মিটাব আমি।

 এই বলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে মুখে চুমু দিতে লাগলো। তারপর কখন  যে কামনার আগুনে পুড়তে শুরু করেছি জানি না। সেই বৃষ্টির রাতে মধুজার সাথে আদিম খেলায় মেতে উঠলাম। রাতের দিকে মাঝে মাঝে আমাকে ওয়াশ রুমে যেতে হয়। ঘুম ভেঙ্গে গেল। কিন্তু ঘুম ভাঙ্গতেই আমার বুকের কাছে একটা ঠাণ্ডা কিছু অনুভব করলাম। কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের আলো এসে পড়েছে ঘরে। সেই আলোয় দেখলাম একটা সাদা হাত এসে পড়েছে আমার  বুকে। ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি খেলে গেল। সেই আলোয় স্পট দেখলাম আমার পাশে পড়ে রয়েছে একটা কঙ্কাল। তারি একটা হাত আমার বুকের উপরে। ভয়ে আমি কোন শব্দ করতে পারছিলাম না। কোন রকমে উঠে বসার চেষ্টা করলাম। আর ঠিক তখনি মধুজার গলা পেলাম - কি হল উঠছো কেন। 

আমার গলায় কোন শব্দ নেই। শুধু গোঙানির শব্দ ছাড়া। 


মধুজা আমায় জোর করে শুয়ে দিল। তখন আবার হাতটা স্বাভাবিক মনে হল। তাহলে কি আমি ভুল দেখলাম। আবার আমি উঠে পড়লাম। আগে আলোটা জ্বালিয়ে দিলাম। দেখলাম মধুজা শুয়ে আছে আর মিটি মিটি হাসছে। 

বললাম - তুমি হাসছো যে। 

সে বলল -  এমনি, তুমি কি স্বপ্ন দেখছিলে?

আমি ভাবলাম - স্বপ্ন কি? আমি যা দেখলাম সেটা স্বপ্ন হতে পারে কি? আমি ওয়াশ রুমে গেলাম। চোখে জল দেব আর প্রসাব করব বলে। 

আয়নার সামনে দাড়াতেই দেখলাম একটা কঙ্কাল এসে দাড়িয়েছে আমার পিছনে। 


তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরলো দেখলাম আমি শুয়ে আছি হাসপাতালের ছোট্ট একটা ঘরে। আমার পাশে তখন কেউ ছিল না। 

কিছুক্ষণ পরে ডাক্তার বাবু এসে বললেন - হোটেলের বিছানায় আপনি অজ্ঞান হয়ে ছিলেন। কেন বলুন তো?

আমি - বিছানায়। আমার তো কিছু মনে পড়ছে না। 

ডাক্তার - মধুজা কে আপনি চিনতেন। হোটেলের রেকর্ড বুক থেকে এই নামটা পেলাম। তিনি কি কল গার্ল? 

আমি কি বলব ভেবে পেলাম না। চুপ করে রইলাম।

ডাক্তার আবার বলল- আসলে পুলিশ কেস হয়ে যাবে তো তাই আরকি জানতে চাইলাম। 

পুলিস কেস মানে তো হাজার ঝামেলা। আমি মন কে শক্ত করে বললাম - উনি আমার বন্ধু। আমারা একে অপর কে চিনি। রাতে হটাতই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই তাই হয়তো ভয়ে মধুজা চলে গিয়েছে। আমাকে ছাড়ার ব্যাবথা করুন আমার কাজ আছে। আমি মধুজার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব। 


কি  ভাবে যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলাম তা আমি জানি। কি কুক্ষণে যে ফোনটা এসেছিল আর কেনই বা যে আমি হোটেলে গিয়ে পড়লাম তা আমি বলতে পারব না।  মধুজা, যাকে সত্যিই আমি ভালবাসতাম সেই মধুজা যে আমার সঙ্গে এমন করবে বুঝতে পারিনি।


 ঘরে এসে ভাবলাম মধুজা কি সত্যিই মানুষ নয়?  কারণ আমার পাশে যে শুয়েছিল সে আর যাই হোক মানুষ নয়। বিদ্যুতের স্পষ্ট আলোয় দেখেছিলাম একটা কঙ্কাল আমার পাশে শুয়ে আছে।  আর ওয়াশরুমের আয়নায় যাকে দেখেছিলাম সেও একটা কঙ্কাল। তাহলে মধুজা কি প্রেতাত্মা?  আমি কি তাহলে কার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে মেতে উঠেছিলাম।

 

হঠাৎ পকেটে চিঠিটার কথা মনে পড়ল। চিঠিটা খুললাম। লেখা আছে 

“প্রিয়,

তোমাকে জ্বালাতন করার জন্য ক্ষমা চাইছি। আমার আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব বলতে কেউ নেই। স্কটল্যান্ডে আমার স্বামী আমাকে হত্যা করেছে। একজন স্কটিস মহিলাকে বিবাহ করার জন্য আমার সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। সেই ঝগড়া চরমে পৌঁছায় এবং তখনই সে আমাকে হত্যা করে। আমার আত্মার মুক্তি চাই। আমার এই আত্মার মুক্তির জন্য যা যা করার তুমি তাই কর। ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে তোমাকে জ্বালাতন করার জন্য। 

ইতি মধুজা”।


পরের দিন এক ব্রাহ্মণ এর কাছে গেলাম। জিয়াগঞ্জের সদরঘাটে গিয়ে মধুজার শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ করলাম। কিন্তু মনের থেকে কখনোই ভুলতে পারছি না যে আমি কোন মধু যার সঙ্গে শুয়েছিলাম। সত্যিই কি সে মানুষ নয়? তবে সেই অনুভূতি কোথা থেকে পেলাম? তাহলে কি আমি ভুতের সঙ্গে রাত কাটালাম? এবার মনে আমি পাগল হয়ে যাব। মন কে কিছুতেই শান্ত  করতে পারছি না।


Post a Comment

You are Welcome to the Kotha Koli

Previous Post Next Post